Wednesday, 4 November 2026

রণজিৎ অধিকারী/ গুচ্ছ কবিতা/ Ranajit Adhikary

 


 

জগৎ 

 

যেহেতু রোববার আসতে ঢের দেরি আছে, তাই 

হয়তো বুধবারের গা থেকেই কিছুটা চেঁছে নিয়ে  

তেমনই কিছু একটা বানিয়ে নিতে হবে।  

তখনই বলেছিলাম, পৃথিবীতে এরকম উদ্ভট কিছু থাকবে  

যাকে বাগে আনতে গেলে সর্বদাই  

                            যন্ত্রপাতিগুলো তোমার হাতের কাছে লাগবে।  

এই হয়তো কিছু জুড়ে দিতে হবে, হয়তো বা 

ঝুলে থাকা কার্নিশটাই অল্প ছেঁটে ফেলতে হবে,  

এমনকি আঁকাবাঁকা ভাগ্যের কারণে এখান-ওখান থেকে  

জুটিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত মন ও পাত্র...  

তবু দূর থেকে জীবনটাকে দেখাবে একটা চমৎকার ভাস্কর্যের মতো,   

কিংবা বাতিল পঙক্তিগুলো দিয়ে বানানো আশ্চর্য কবিতা!  

 

পঙক্তি —প্রায়ই যা চেঁছে ফেলতে হয়, জোড়া লাগাতে হয়  

টুকরো মাপ মতো — তার স্কেল, কম্পাস — 

তার অভাবেই জীবন তোমার এমন হয়ে আসবে যে,   

 

সেখান থেকে জগৎটাকে আশ্চর্য একটা পিণ্ড মনে হবে!  

 

 

 

খসড়া 

 

ধারণাটা কোনোমতে দাঁড়িয়ে গেলে প্রথমেই যা করতে হবে  

তা হল কোণগুলোকে মুড়ে দেওয়া, যাতে  

নতুনের খোঁচা না লাগে ; তারপর ধীরেসুস্থে  

আর কেউ বুঝে ওঠার আগেই খসড়াগুলো মুছে ফেলা! 

 

সমুদ্র দেখতে গিয়ে টের পাবে — কী বিশাল সব খসড়া ছিল  

ওকে বানানোর আগে, ছিঁড়ে ছুঁড়েফেলাগুলো দিয়েই হয়তো ত্রুটিপূর্ণ   

আরো কতক সমুদ্র বানিয়ে তোলা যেত আর তখন  

সেই নতুন ধারণার সামনে দাঁড়িয়ে টেরই পেতে না এই সমুদ্রের ধারণাটা!    

 

  

আকাশ 

 

 বাইরে থেকে এনে বসানো অনেকটা ঢাকনার মতো,  

অসংখ্য ছিদ্র রাখা যাতে হাওয়া চলাচল ব্যাহত না হয় 

এবং মোটামুটি স্বচ্ছ, নক্ষত্রদের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের জন্য!  

 

এনার্জি আর ম্যাটারগুলিকে অস্বীকার করেই বরাবর তাকে  

উদারতার প্রভু বানানো হয়েছে অথচ তার গ্রাস করে ফেলবার  

                              অসম্ভব ক্ষমতাকে যথেষ্ট নিন্দা করা হয়নি! 

 

প্রসারণশীল এবং সীমাকে তোয়াক্কা না করে বিস্ফোরণের জন্য সে প্রস্তুত ; এমনকি  

একই তলে সে মাখনের মতো তার গর্ভে ঢুকিয়ে নেয় 

নাক্ষত্র, পার্থিব ও প্রাণসম্পর্কিত উপাদানগুলিকে!   

 

কফিন 

 

 

মৃতদেহটা থেকে যায় বাইরেই, 

তার বদলে কফিন ভর্তি করা হয় যথেষ্ট ভালোবাসা কান্না আর  

দীর্ঘশ্বাসে এবং সেকারণেই বহুকাল পরেও 

একটা কফিনের কাছে দাঁড়াতে গা ছমছম করে!  

 

মৃতদেহটা আগের চেয়েও বেশি নড়েচড়ে,  

কথা বলে, মাথার ভেতর চাপ তৈরি করতে থাকে,  

এমনকি সে তার পুরোনো কোটটা গায়ে দিয়েই  

আমাদের সঙ্গে সমুদ্র-তটে গিয়ে ঘুরে বেড়ায়...   

 

কী আশ্চর্যের ব্যাপার যে, কফিন-ভীতি থেকেই  

একটা মৃতদেহ কখনোই নিজেকে অনুভূমিক অবস্থানে রাখে না ; সে  

বরাবর পৃথিবীর সঙ্গে  

                             নিরাকার উল্লম্ব একটা সম্পর্ক তৈরি করে নেয়!  

 

 

দেওয়াল  

 

 

দেওয়ালের ওই এক পুরোনো অভ্যাস হল— আড়াল করা ; এমনকি  

বাইরের দৃষ্টান্তগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা!  

যেমন দুটো সত্যের মাঝখানে সে দাঁড়িয়ে থাকে, 

সহজাত ও তৈরি হয়ে ওঠা সত্যের মধ্যে সে বিভেদ করে — এবং  

তার এই আচরণে কখনোই স্থির করে ওঠা যায়নি যে একজন দ্রষ্টা হিসেবে কেউ  

দাঁড়াবে কোথায়! — একজন কবি কি মামুলি দৃশ্যগুলোকেই তার অনুষঙ্গ হিসেবে বেছে নেবে?  

 

সে বরাবর দূরে সরিয়ে রাখে শূন্যের বিশালতা এবং  

                                                                    একটা পাতার নৈঃশব্দ্য!  

সে বড়জোর দেওয়ালের এপারে এনে রাখে অতি সূক্ষ্ম কিছু যান্ত্রিক কৌশল  

অথবা আমাদেরই হাতে করে তোলা জগতের প্রতিরূপ!  

 

যেন তোমাকে বেছে নিতে বাধ্য করে সে— দুটো জগতের একটাকে  

                                                        আর তাকে বিভাজিকা বলে মেনে নিতে!  


 

 


No comments:

Post a Comment