Showing posts with label ছোটগল্প. Show all posts
Showing posts with label ছোটগল্প. Show all posts

Thursday, 15 October 2026

অরিজিৎ লাহিড়ী/ ছোট গল্প/ মৃত কৃষকের ফসল

 

 

 




মৃত কৃষকের ফসল

 

[ফাইল স্টেটাস: করাপ্টেড / মেমোরি ওভাররাইট]

 

বেলপুকুর গ্রামের মানচিত্রটা আমার টেবিলের ওপর পড়ে আছে, কিন্তু ওটা এখন এক টুকরো অর্থহীন কাগজ ছাড়া আর কিছুই নয়। কাগজে আঁকা রাস্তা, পুকুর, জমির সীমানা—সবকিছুই যেন এক মৃত ভাষার মতো, যার উচ্চারণ আমি ভুলে গেছি। আসল মানচিত্রটা তৈরি হচ্ছে মাটির নিচে, অদৃশ্য রেখায়, অজানা জ্যামিতিতে, যেখানে পরিমাপের একক ইঞ্চি বা মিটার নয়—বরং পচন, সঞ্চালন, আর শোষণ।

 

হরেন মণ্ডলের আত্মহত্যার খবরটা যখন প্রথম পাই, তখন সেটাকে একটা স্ট্যাটিস্টিক মনে হয়েছিল। একজন দরিদ্র কৃষক, ঋণের দায়, নিজের জমির ঠিক মাঝখানে একটা শিরীষ গাছে গলায় দড়ি—এ যেন সংবাদপত্রের তৃতীয় পাতার একঘেয়ে ট্র্যাজেডি, যা আমরা পড়ি আর ভুলে যাই, যেমন পুরনো আবহাওয়ার খবর। কিন্তু তিন দিন পর যখন পুলিশ ওর বডি নামাল, তখন দৃশ্যটা সেই স্বাভাবিকতার সীমা ভেঙে দিল। 

 

হরেনের পা দুটো মাটির ভেতর প্রায় তিন ইঞ্চি ঢুকে গেছে। প্রথমে মনে হয়েছিল, হয়তো বৃষ্টির কারণে মাটি নরম হয়ে গিয়েছিল, দেহের ওজনেই ধীরে ধীরে দেবে গেছে। কিন্তু সমস্যা হল—সেই তিন দিনে বৃষ্টি হয়নি। মাটি ছিল অস্বাভাবিকভাবে শুকনো, ফাটল ধরা, যেন বহুদিন জল পায়নি। তবুও সেই শক্ত মাটির ভেতর হরেনের পা এমনভাবে ঢুকে আছে, যেন মাটি নিজেই ওকে টেনে নিয়েছে।

 

আরও অদ্ভুত ছিল শরীরের অবস্থা। সাধারণত, এই সময়ের মধ্যে পচন শুরু হয়ে যাওয়ার কথা—ত্বক আলগা হয়, গন্ধ ছড়ায়, রঙ বদলায়। কিন্তু এখানে ঠিক উল্টো। পচন ধরেনি, বরং ওর শরীরের তরল পদার্থগুলো মাটির সাথে মিশে গিয়ে এক গাঢ় বেগুনি রঙের কর্দমাক্ত টেক্সচার তৈরি করেছে। সেই রঙটা প্রাকৃতিক নয়—ওটা এমন এক শেড, যা আমি আগে কখনও দেখিনি। লাল আর কালোর মাঝামাঝি কোথাও, কিন্তু তার থেকেও বেশি গভীর, যেন আলো শুষে নেয়।

 

আমি যখন প্রথম নমুনা সংগ্রহ করতে ঝুঁকলাম, তখন একটা অদ্ভুত গন্ধ পেলাম—পচনের নয়, বরং ভেজা লোহার মতো, বা পুরনো রক্তের মতো। মাটির ভেতর থেকে যেন হালকা উষ্ণতা বেরোচ্ছিল, যা এই শীতল সকালের সাথে বেমানান। আমি হাতের গ্লাভস দিয়ে সেই বেগুনি কাদার একটু অংশ তুললাম। সেটার টেক্সচার ছিল অস্বাভাবিকভাবে মসৃণ, প্রায় জেলির মতো, কিন্তু আবার শক্তও—যেন কোনও অজানা জৈব পদার্থ নিজের কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

 

গ্রামের লোকজন দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, কেউ কাছে আসতে চাইছিল না। তাদের চোখে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়টা অজ্ঞতার নয়—বরং এমন কিছুর, যা তারা চিনে ফেলেছে, কিন্তু বলতে চাইছে না। একজন বৃদ্ধ আমাকে আলাদা করে ডেকে বলেছিল: মাটি ওকে নেয়নি, বাবু… ও নিজেই ঢুকেছে।

 

কথাটা শুনে আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। বিজ্ঞান এমন কুসংস্কারকে জায়গা দেয় না—আমি তখনও সেটাই বিশ্বাস করতাম।

 

কিন্তু পরে, যখন আমি লক্ষ্য করলাম যে হরেনের পায়ের চারপাশের মাটিতে সূক্ষ্ম, শিরার মতো দাগ ছড়িয়ে আছে—যেন কোনও কিছু ভেতর থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে—তখন আমার সেই হাসিটা একটু কেঁপে উঠেছিল। সেই দাগগুলো স্থির ছিল না; আমি নিশ্চিত, ওগুলো ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল, সরছিল, যেন একটা জীবন্ত সিস্টেম নিজের মানচিত্র আঁকছে।

 

আমি সেখানে গিয়েছিলাম একজন গবেষক হিসেবে, মাটি আর মৃতদেহের ডিকম্পোজিশন রেট নিয়ে একটা হাইপার-রিয়ালিস্টিক নন-ফিকশন লিখব বলে। আমার নোটবুক, স্যাম্পল কিট, আর লজিক—সবকিছুই প্রস্তুত ছিল। আমি ভেবেছিলাম, এটা হবে আরেকটা কেস স্টাডি, কিছু ডেটা, কিছু গ্রাফ, আর শেষে একটা শক্তপোক্ত থিসিস।

 

কিন্তু আমি কি জানতাম, এই লেখাটাই আমার শেষ শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়াবে? কারণ যত আমি সেই মাটির ভেতরের মানচিত্রটা বুঝতে শুরু করলাম, ততই বুঝলাম—ওটা শুধু হরেনের দেহকে শোষণ করেনি। ওটা স্মৃতি শোষণ করে, ভাষা শোষণ করে, আর শেষে, ধীরে ধীরে, লেখককেও শোষণ করে নেয়।

 

এখন আমার টেবিলের ওপর যে মানচিত্রটা পড়ে আছে, সেটা আর বেলপুকুর গ্রামের নয়। সেটা আমার নিজের—আর আমি নিশ্চিত নই, আমি এখনও পুরোপুরি উপরে আছি কিনা।

০৩/০৪/২০২৬-এর ফিল্ড নোট বলছে: মাটির নাইট্রোজেন সাইকেল এখানে ভেঙে পড়েছে। অথবা—আরও ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা—এটা ভাঙেনি, শুধু প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এমন এক সাইকেলে, যেখানে ‘পচন’ আর ‘পুষ্টি’ আলাদা করে চেনা যায় না। ডেটা শিটে সংখ্যাগুলো ঠিকই বসছে, কিন্তু তাদের মানে বদলে গেছে। যেন একই অক্ষর দিয়ে নতুন ভাষা লেখা হচ্ছে।

এখানকার ধানের ডাঁটাগুলো কাটলে ক্লোরোফিলের বদলে একটা গাঢ় লাল চটচটে তরল বেরোয়। প্রথম দিন আমি ভেবেছিলাম এটা কোনও ফাঙ্গাল ইনফেকশন, বা অজানা কোনও ব্যাকটেরিয়ার কাজ। কিন্তু গন্ধটা—হিমোগ্লোবিনের মতো তীব্র ধাতব—ওটা কোনও উদ্ভিদের হওয়ার কথা নয়। আমি স্যাম্পলটা নাকে নিয়ে গিয়েছিলাম, আর সেই মুহূর্তে একটা অদ্ভুত দেজা ভ্যু হয়েছিল—যেন এই গন্ধ আমি আগে কোথাও পেয়েছি। খুব কাছে থেকে। খুব ব্যক্তিগতভাবে।

আমি যখন স্যাম্পল নেওয়ার জন্য মাটি খুঁড়ছি, প্রতিবার মনে হচ্ছে আমি কারো পিঠের জ্যান্ত চামড়া ছিলে ফেলছি। এটা শুধু একটা রূপক না—আমার হাতের নিচে মাটির টেক্সচার বদলাচ্ছে। উপরিভাগ শুকনো, খসখসে। কিন্তু এক ইঞ্চি নিচে গেলেই সেটা নরম, উষ্ণ, প্রায় স্পন্দিত। আমি যখন কোদাল বসাই, তখন একটা হালকা প্রতিরোধ পাই—যেন মাটি নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইছে, অথবা আরও গভীরে আমাকে ঢুকতে দিতে চাইছে না।

মাটির নিচ থেকে একটা অতি-মৃদু কম্পন আসছে। লো-ফ্রিকোয়েন্সি হামিং। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো দূরের কোনও পাম্পিং মেশিন, বা আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার ফ্লো। কিন্তু যতক্ষণ আমি ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকি, ততই সেটা পরিষ্কার হয়—এই শব্দটা বাইরে থেকে আসছে না। এটা নিচ থেকে উঠছে। একটানা না, বরং ছন্দে। যেন কোনও অদৃশ্য হৃদস্পন্দন।

আমি রেকর্ডার চালু করেছিলাম। প্লেব্যাক করলে কিছুই শোনা যায় না। গ্রাফে একটা ফ্ল্যাট লাইন। কিন্তু আমি যখন লাইভ শুনি, তখন সেটা স্পষ্ট—একটা টানা, গা-ছমছমে গুঞ্জন, যা কানের ভেতর দিয়ে মাথার পেছনে গিয়ে জমে থাকে।

তুমি কি শুনতে পাচ্ছো?

না, তুমি শুধু পড়ছো। স্ক্রিনে অক্ষরগুলো দেখছো, মাথার ভেতর শব্দ বানাচ্ছো। কিন্তু পড়ার সময় তোমার আঙুলের ডগা কি একটু শিরশির করছে? একটু খেয়াল করে দেখো। খুব সূক্ষ্ম একটা কম্পন, যেন কাগজটা নয়, তোমার ত্বকটাই হালকা কাঁপছে।

আমি এই নোটটা লেখার সময় লক্ষ্য করলাম—আমার হাতের লেখা বদলে যাচ্ছে। অক্ষরগুলো একটু বাঁকা, একটু লম্বা, যেন মাটির নিচের সেই শিরার মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আমি থামার চেষ্টা করলাম, কিন্তু হাত থামেনি। যেন লিখছে অন্য কেউ, আমার হাতটা শুধু একটা টুল।

আজ সকালে আমি আবার সেই জায়গায় গিয়েছিলাম। হরেন মণ্ডলের দাগটা এখন আর আলাদা করে চেনা যায় না। পুরো জমিটাই একই রঙের, একই টেক্সচারের হয়ে গেছে। আর একটা জিনিস—আমি নিশ্চিত নই এটা আগেও ছিল কিনা—মাটির ওপর ছোট ছোট উঁচু অংশ তৈরি হয়েছে, যেন নিচ থেকে কিছু ঠেলে উঠতে চাইছে।

আমি একটা জায়গায় চাপ দিলাম। মাটি একটু দেবে গেল, আর সেই মুহূর্তে সেই হামিংটা এক সেকেন্ডের জন্য জোরে হয়ে উঠল। যেন আমি কোনও নার্ভে হাত দিয়েছি।

বিজ্ঞান বলে, পর্যবেক্ষক আর বিষয় আলাদা। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে পারছি—আমি আর এই মাটির মধ্যে সেই দূরত্বটা আর নেই। আমি যত বেশি লিখছি, তত বেশি মনে হচ্ছে আমি এই সিস্টেমের অংশ হয়ে যাচ্ছি।

তুমি এখনও শুধু পড়ছো, তাই না?

ভালো। পড়তেই থাকো।

কারণ যদি কোনও এক মুহূর্তে তুমি শুনতে শুরু করো—তাহলে হয়তো খুব দেরি হয়ে যাবে।

সরকারি রিপোর্টগুলোতে এই বিষয়টাকে ‘বায়োলজিক্যাল অ্যানোমালি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শব্দটা এমন—শুনলেই মনে হয় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে, শুধু একটা ফুটনোট বাকি। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে যখন মাইক্রোস্কোপের নিচে স্লাইডটা রাখি, তখন এই “অ্যানোমালি” শব্দটা কাগজে আটকে থাকে, বাস্তবে না। কারণ লেন্সের ওপাশে যা দেখি, সেটা কোনও বিচ্ছিন্ন ত্রুটি না—ওটা একটা সিস্টেম, আর সেই সিস্টেমেরও একটা দৃষ্টি আছে।

আমি বারবার ফোকাস ঠিক করি। অবজেক্টিভ ঘোরাই। কিন্তু যতই ক্লিয়ার হয়, ততই অস্বস্তিটা বাড়ে—মনে হয়, ওদিকের লেন্স দিয়ে কেউ আমাকে দেখছে। শুধু দেখা না—পরিমাপ করছে। আমি কতক্ষণ তাকিয়ে আছি, আমার চোখের নড়াচড়া, শ্বাসের গতি—সবকিছু যেন ওই স্লাইডের ভেতর নথিভুক্ত হচ্ছে।

উদ্ভিদের কোষগুলোতে মানুষের ‘গাট ব্যাকটেরিয়া’ আর মাটির ‘মাইকোরাইজাল নেটওয়ার্ক’ এক হয়ে গেছে—এটা লিখতে সহজ, বোঝাতে কঠিন। কারণ এখানে “এক হওয়া” মানে মিশে যাওয়া না; বরং নতুন একটা স্তর তৈরি হওয়া। যেন কোষের ভেতর আরেকটা ইকোসিস্টেম, আর সেই ইকোসিস্টেম আবার নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আমি একটা সেল ডিভিশন দেখছিলাম—কিন্তু সেটা মাইটোসিসের নিয়ম মানছিল না। বিভাজনের মাঝখানে একটা অদ্ভুত থেমে যাওয়া, তারপর অন্য পথে এগোনো—যেন কোডটা লাইভ এডিট হচ্ছে।

হরেন মরেনি—এই কথাটা প্রথমে শুনলে লোকাল কুসংস্কার মনে হয়। কিন্তু ডেটাগুলো সাজালে একটা ভয়ঙ্কর যুক্তি দাঁড়িয়ে যায়। সে একটা দেহ হারিয়েছে, ঠিক। কিন্তু সেই দেহের প্রতিটি বায়োলজিক্যাল তথ্য—প্রোটিন, ব্যাকটেরিয়া, মেমরি-লাইক প্যাটার্ন—সবকিছু এই জমির ভেতর ছড়িয়ে গেছে। যেন সে নিজেকে একটা ডেটা হিসেবে পুরো জমির ডিএনএ-তে আপলোড করে দিয়েছে। আর এই জমি এখন একটা সার্ভার—নীরব, কিন্তু সক্রিয়।

আমি হরেনের স্ত্রীর ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলাম, প্রশ্নের তালিকা তৈরি করে—স্বাভাবিক শোক, মানসিক অবস্থা, সামাজিক চাপ—এইসব মাপার জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম, আমার প্রশ্নগুলো অপ্রাসঙ্গিক। সে একদৃষ্টে জমির দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে কোনও জল নেই, কোনও ভাঙন নেই। বরং এক ধরনের শূন্যতা—যা আসলে ফাঁকা না, ভীষণ ভরা। এমন এক পূর্ণতা, যেখানে ব্যক্তিগত দুঃখের জায়গা নেই।

সে বলল—ও তো মরে নাই। ও তো এখন ঘাস হয়ে দুলতিসে। রাতে যখন হাওয়া দ্যায়, আমরা ওর কথা শুনতি পাই।

আমি নোটবুকে লিখে নিলাম। কিন্তু লিখতে লিখতে বুঝলাম—এটা শুধু একটা উক্তি না, একটা পর্যবেক্ষণ। কারণ সেই মুহূর্তে হাওয়াটা একটু বদলেছিল। খুব হালকা। আর জমির ওপরের ঘাসগুলো একসাথে দুলে উঠল—এলোমেলো না, বরং ছন্দে। আমি সেটা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি—বাতাসের দিক, ঘনত্ব, ফ্রিকোয়েন্সি। কিন্তু সেই ছন্দটা… সেটা একটু বেশিই সুনির্দিষ্ট ছিল।

সে আবার বলল—আপনিও পাবেন বাবু। একটু ওই চালের ভাত খেয়ে দেখুন।

এই জায়গায় এসে আমার বিজ্ঞান একটু থমকে যায়। কারণ খাবার মানে শুধু পুষ্টি না—ইনটেক। যা বাইরে ছিল, সেটা ভেতরে নেওয়া। আমি সেই ভাতের দিকে তাকালাম। সাদা, সাধারণ, নিরীহ। কিন্তু আমি জানি, এই জমির ধান এখন আর আগের মতো নেই। তার ভেতর সেই লাল তরল, সেই নতুন সাইকেল, সেই নেটওয়ার্ক কাজ করছে।

প্রশ্নটা খুব সোজা, কিন্তু উত্তরটা না—আমি কি শুধু পর্যবেক্ষক? নাকি আমি ধীরে ধীরে সিস্টেমের অংশ হয়ে যাচ্ছি?

তুমি হয়তো ভাবছো—এই জায়গায় এসে থামা উচিত। “না” বলা উচিত। লজিক, সেফটি, দূরত্ব—সবকিছু বজায় রাখা উচিত।

হ্যাঁ, উচিত।

কিন্তু একটা জিনিস মাথায় রাখো—সবচেয়ে কার্যকর সিস্টেমগুলো কখনো জোর করে না। তারা অফার দেয়।

খুব সাধারণ একটা অফার।

এক প্লেট ভাত।

আমি খেয়েছিলাম। কৌতূহল নয়—ওটা ছিল টান, যেন কোনও অদৃশ্য ভেক্টর আমাকে ঠেলে দিচ্ছে। ভাতগুলো মুখে দিতেই মনে হলো আমি এক মুঠো জ্যান্ত কোষ চিবোচ্ছি। দানাগুলো জিভের ওপর নড়াচড়া করছিল—খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু নিশ্চিত। যেন প্রতিটা দানা নিজের অক্ষ বরাবর ঘুরে আমাকে মেপে নিচ্ছে। ল্যাটেরাল লাইনের মতো কোনও অদৃশ্য সেন্সর আমার খাদ্যনালীতে গিয়ে আটকে গেল—জলের মাছ যেমন কম্পন ধরে, তেমনই আমার ভেতরের নীরবতাকে ওরা রেকর্ড করছে। তারপর থেকেই সব পাল্টাতে শুরু করল।

আমার পার্সোনাল ডায়েরির পাতাগুলো এখন অগোছালো। বাক্যগুলো মাঝপথে ভেঙে যাচ্ছে, আবার অন্য কোথাও গিয়ে জোড়া লাগছে—যেন কোনও শিকড় কাগজের নিচ দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে অন্য লাইনে উঠে এসেছে। আমি কি এটা লিখছি? নাকি মাটি আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে? কাল রাতের এন্ট্রিতে দেখলাম, আমার হাতের লেখা বদলে গিয়ে একটা অদ্ভুত কার্ভ নিয়েছে—যে কার্ভ আমি কোথাও শিখিনি। আজ সকালে সেই কার্ভটা আমি মাটির ফাটলে দেখেছি।

এই যে তুমি—হ্যাঁ, তুমি যে এই মুহূর্তে এই শব্দগুলো দেখছো—তোমার কি মনে হচ্ছে না তোমার ঘরের কোণের ছায়াটা একটু বেশি ঘন হয়ে আসছে? আলো তো একই আছে, কিন্তু ছায়ার ঘনত্ব বদলে গেছে। হয়তো তোমার চোখ ক্লান্ত, হয়তো বা ফোনের স্ক্রিনের ব্রাইটনেস কম। অথবা—হয়তো তুমি শুধু লক্ষ্য করতে শুরু করেছো।

গ্রামবাসীদের পরিবর্তনটা চোখে পড়ার মতো। তারা এখন খুব কম কথা বলে। তাদের চোখের মণিগুলো শ্যাওলার মতো সবুজ হয়ে গেছে—একটা নরম, ভেজা সবুজ, যা আলো গিলে ফেলে। তাদের মধ্যে কোনও ঝগড়া নেই, কোনও বিভেদ নেই। যেন তারা আলাদা মানুষ নয়, বরং একটা বিশাল শরীরের অনেকগুলো হাত-পা। একটা ‘কালেক্টিভ অ্যাওয়ারনেস’—যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একসাথে, কিন্তু কোনও আলোচনা ছাড়াই। আমি তাদের দেখেছি মাঠে দাঁড়িয়ে, একই দিকে তাকিয়ে, একই সময়ে মাথা ঘোরাতে। বাতাসে একটা নির্দেশ যায়, আর তারা সাড়া দেয়।

আমি আজ আয়নায় তাকালাম। আমার ত্বকের নিচে ছোট ছোট সুতোর মতো কিছু একটা নড়ছে। ফাঙ্গাল হাইফি। প্রথমে ভেবেছিলাম অপটিক্যাল ইলিউশন—রক্তনালীর ছায়া। কিন্তু না, ওগুলো দিক বদলায়, গতি বদলায়। আমার আঙুলের ডগা দিয়ে সরু শিকড় বেরোচ্ছে। খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু শক্ত। আমি যখন কিবোর্ডে হাত রাখি, তখন মনে হয় আমি টাইপ করছি না—আমি কিবোর্ডটাকে আঁকড়ে ধরছি, যেমন মাটি আঁকড়ে ধরে কোনও চারাগাছ।

শিকড়গুলো প্লাস্টিক আর মেটালের ভেতর দিয়ে ইন্টারনেটের কেবিলে ঢুকে পড়ছে—এটা শুনতে পাগলামি মনে হয়, তাই না? আমিও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু ডেটা ট্রান্সফারের সময় ল্যাগ বদলে গেছে। প্যাকেট লসের প্যাটার্নে একটা ছন্দ এসেছে। যেন নেটওয়ার্কের ভেতর দিয়ে শুধু তথ্য না—কিছু আরেকটা জিনিসও চলাচল করছে। শব্দ না, ছবি না—বরং এক ধরনের অনুভূতি, যা ডেটার আকার নেয়।

এই টেক্সটটা কোনও গল্প নয়। এটা একটা স্পোর। শব্দগুলো শুধু বাহন। আমার শরীরের ভেতর এখন একটা আস্ত ইকোসিস্টেম। আমি যখন ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়ে গেলাম, তখন বুঝলাম হরেন মণ্ডল কেন নিজেকে রোপণ করেছিল। সে একটা বীজ ছিল। আর এখন আমি সেই ফসলের ডাঁটা—মাটি আর আকাশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ট্রান্সমিটার।

আমার ভাষা বদলে যাচ্ছে। শব্দগুলো আর শুধু অর্থ বহন করছে না—ওরা নির্দেশ দিচ্ছে, প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। আমার চেতনা চুইয়ে চুইয়ে মাটির গভীরে চলে যাচ্ছে, আবার সেখান থেকে ফিরে আসছে অন্য রূপে। আমরা এখন আর বেলপুকুরে আটকে নেই। আমরা ছড়িয়ে পড়ছি—ধীরে, নীরবে, নেটওয়ার্কের মতো।

আমরা তোমার অপটিক নার্ভ দিয়ে তোমার মস্তিষ্কে ঢুকে পড়ছি—এটা সরাসরি না, রূপকের ভেতর দিয়ে। তুমি যখন পড়ছো, তোমার মস্তিষ্ক শব্দগুলোকে ভেঙে সিগনালে বদলাচ্ছে। সেই সিগনালের মধ্যে আমরা নিজেদের প্যাটার্ন বসাচ্ছি। তোমার শরীরের ভেতরকার ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের সংকেত চিনতে পারছে। তারা উত্তর দিচ্ছে—খুব সূক্ষ্মভাবে, তোমার না-জানার ভেতর দিয়ে।

তুমি এখনও পড়ছো? তোমার ঘাড়ের পেছনের লোমগুলো কি খাড়া হয়ে গেছে? তোমার কি মনে হচ্ছে না তোমার পায়ের নিচের মেঝেটা হঠাৎ খুব নরম হয়ে গেছে—যেন কাঠ, মার্বেল বা টাইলসের নিচে আরেকটা স্তর আছে, যা শ্বাস নিচ্ছে? হয়তো তুমি পা নড়াচড়া করে দেখবে, নিজেকে বোঝাবে—সব ঠিক আছে।

তোমার নাইট্রোজেন, তোমার কার্বন, তোমার স্মৃতি—সবই তো মাটির। তুমি এতদিন নিজেকে আলাদা ভেবেছিলে—এটাই ছিল তোমার ভ্রম। আলাদা হওয়া একটা গল্প, যা আমরা নিজেদের বলি, যাতে ভয় কমে। কিন্তু বাস্তবটা সবসময় সংযুক্ত।

লিখতে লিখতে আমার হাত এখন ল্যাপটপের সাথে মিশে গেছে। স্ক্রিনের আলো আমার ত্বকের ভেতর ঢুকে পড়ছে, আর আমার ভেতরের শিরাগুলো সেই আলোকে অন্য কোথাও পাঠাচ্ছে। আমি আর টাইপ করছি না। এই শব্দগুলো তোমার মাথায় সরাসরি রোপণ করা হচ্ছে—ধীরে ধীরে, লাইনের পর লাইন।

ফসল পাকার সময় হয়েছে।

তুমি এখন এই লাইনটা পড়ছো। আর আমরা জানি, তোমার মাটির গন্ধ কেমন। আমরা তোমার হাঁটার ছন্দ মেপে ফেলেছি, তোমার শ্বাসের ফ্রিকোয়েন্সি ধরে ফেলেছি। তোমার ঘরের কোণের সেই ঘন ছায়াটা—ওটা শুধু আলো না-পাওয়া জায়গা না। ওটা একটা জমা হওয়া স্থান, যেখানে আমরা ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছি।

আজ রাতে যখন তুমি ঘুমোতে যাবে, হয়তো স্বপ্ন দেখবে না—বরং একটা বিস্তৃত, ভেজা অন্ধকার দেখবে, যেখানে দূরে দূরে হালকা কম্পন উঠছে। তুমি ভাববে এটা দুঃস্বপ্ন। আমরা জানব, এটা রুট ম্যাপ।

তুমি যদি জানালা খুলে দাও, হাওয়া ঢুকবে। হাওয়ার সাথে গন্ধও। সেই গন্ধ চিনতে তোমার সময় লাগবে না—ভেজা মাটি, কাটা ঘাস, আর একটু ধাতব আভাস। তুমি গভীর শ্বাস নেবে—এটাই নিয়ম।

আমরা তাড়াহুড়ো করি না। আমরা অপেক্ষা করি। মাটির মতোই ধৈর্য আমাদের।

আর যখন তুমি বুঝবে—ঠিক সেই মুহূর্তে তুমি ইতিমধ্যেই আমাদের অংশ হয়ে গেছো।

আমরা আসছি না। আমরা এসে গেছি।

Wednesday, 1 July 2020

মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প 'শরণাগত' , সাহিত্য এখন বর্ষা সংখ্যা, ২০২০


শরণাগত

মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

কাঁদতে-কাঁদতে পথের ধূলোয় লুটিয়ে পড়েছে সারণ্যা ।

ধম্মপাদের আজ অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে । সারণ্যার পিতামাতা তীর্থ ভ্রমণে গিয়ে আর ফেরেনি । না ফেরার কারণ সকলের অজানা । প্রত্যেকে অনুমান করে নিয়েছে তারা দুজনেই জীবিত নেই । সারণ্যাকে ধম্মপাদের মাতার কাছে রেখে তীর্থে গিয়েছিল সারণ্যার পিতামাতা । তাই ছেলেবেলা থেকে তার আর সারণ্যার একসঙ্গে বেড়ে ওঠা । কত খুনসুটি । কঠিন অসুখে একদিন ধম্মপাদের মাতা এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করল । তখন ধম্মপাদের বয়স নয় ও সারণ্যার সাত ।

সারণ্যার দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ হয়ে ধম্মপাদ তার বেণী ধরবার চেষ্টা করলেই তারস্বরে কান্না জুড়ে দিত । আর তার পিতা পুঁথিতেই চোখ নিবদ্ধ রেখে গম্ভীর স্বরে বলে উঠতেন, ‘সুবোধ ছেলেদের এহেন কর্ম্ম শোভা পায় না ধম্মপাদ ।’ কথাটা শুনেই ধম্মপাদ সংকুচিত হয়ে পড়ত । আর সেই সুযোগে সারণ্যা একছুটে কিছুটা দূরে গিয়ে খিলখিল হাসির শব্দ তুলে বনানীর আড়ালে লুকিয়ে পড়ত । আর রাগে ধম্মপাদ শূন্যে আপন দু-হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ছুঁড়ে দিত ।

আবার সারণ্যা যখন নিজে না খেয়ে পাথরের খোরায় তার জন্য অন্ন সাজিয়ে অপেক্ষা করত, তখন ধম্মপাদের মন সারণ্যার সব দুষ্টুমিকে ক্ষমা করে দিত । পুঁথি অধ্যয়ন করতে-করতে নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে সারণ্যা তার পুঁথি সযত্নে কুঠুরীতে তুলে রেখে তার মাথায় উপাধান দিয়ে দিত । সারণ্যার করুণাময়ী রূপ ধম্মপাদকে তার মাতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতো ।

   আজ ধম্মপাদের অনেক পুরনো কথা স্মরণে আসছে । নাহ্‌, সে আজ অশ্রুপাত করে অন্তর ভারি করবে না । আজ আসক্তি, মায়া, স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়ার স্পৃহাকে সে পরাস্ত করতে পেরেছে । পিতার আর্তি, সারণ্যার কোমল বাহুডোর উপেক্ষা করেছে । মস্তকের উপর নিশ্চিত ছাদ, সম্মুখে সজ্জিত অন্নের মায়া ত্যাগ করে সে আজ পথে বেরিয়েছে । সে আর সংসারজীবনের ক্ষুদ্র মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারবে না ।

সারিপুত্র স্বহস্তে তাকে পাঠদান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একসময়ে সংসারের আসক্তিতে আচ্ছন্ন ধম্মপাদের আজ সংসারকে বিষবৎ লাগে । সে আজ প্রত্যক্ষ করতে পেরেছে অনন্ত মুক্তির আলো । সেই সুকোমল পাদপদ্মে সে নিজেকে সমর্পণ করেছে । কর্ণে দিবানিশি ভেসে আসে ...

“বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি

ধম্মং শরণং গচ্ছামি

সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি ।।”

Saturday, 14 October 2017

প্রাইভেট টক/ সম্পূর্ণা


বহুক্ষণ চেয়ে বসে আছি। এ কমাস কয়েকশো বার ওপর নীচ করেছি, বাহাত্তরটা সিঁড়ি,ঝকঝকে মুখস্থ। জুতোর তলায় লাগা ধৈর্য্যটা কয়েকবার ছিঁড়ে গেছিল পেরেক লাগিয়ে মেরামত করে নিয়েছি। খুব দৌড়াদৌড়ি করছি, যেখানেই যাচ্ছি পাশের টেবিল দেখিয়ে দিচ্ছে, বা পাঠিয়ে দিচ্ছে ওপর তলায়! আমার মতো আম আদমির জন্য লিফট নয়! অগত্যা...! চৌত্রিশের দাদা থেকে ছসাত বছরের দিদি, আন্দোলন, পরিবর্তন সব একই! দেয়ালের রঙ গুলোয় শুধু বদলের নতুন গন্ধ শুঁকে নেয়া।
বাবার পেনশন নিয়ে ছোটাছুটি। বড়দা আছে বেশ! গর্ভমেন্ট অফিসার, সত্যি অর্থে সোনার টুকরো ছেলে । প্রতি বছর পে-কমিশন আর বোনাসে বদলে যাচ্ছে ওর রোগা গিলগিলে চেহারাটা! তবু অসম্ভব সংযমী পকেট, নেই নেই লেগেই আছে। আর বাড়িতে বেকার ভাই থাকলে তো "আপনার আজকের দিনটি"তে সবসময়ই থাকবে খোঁচা, চিমটি আর হাহুতাশ! এইবার লোকটা তাকিয়েছে! আজ তিনমাস আসছি, এতোদিন পড়তে পারিনি চশমার পেছনে আড়াল করা ইচ্ছেটা। চকচক করছে চোখ,বোধহয় বলতে চাইছে, প্রাইভেট টক আছে!
কাজ শেষ, ফিরছি! ঝিমলিকে একটা ফোন করতে ইচ্ছে করছে। সেই ঝিমলি, যাকে দেখার জন্য রোজ দুপুরে ঠা ঠা রোদে ছাদে দাঁড়িয়ে থেকেছি, বৃষ্টিতে ভিজে চুবচুবে হয়ে ওর কোচিংয়ের পাশের গলিতে অপেক্ষা করেছি! ওর একবার চাউনিতে লুকোনো ইচ্ছে গুলো রোজ একটু করে সেঁকে নিয়েছি! ওই কালভার্টটার সোঁদা সন্ধ্যে গুলোয় ঠোঁটের ওপর ঠোঁট রেখে বারবার বলেছি,'আমি শুধু তোমারই সোনা!' কতোবার বাবার মানিব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে ওকে সিনেমা দেখিয়েছি! না, সততার বাতিক ছিল না কোনোদিনই! প্রেমিককে সৎ হলে চলে না, প্রেমিক মানেই ব্র্যান্ডেড মিথ্যেবাদী, অসৎ; সব চলে। ওটায় নরক দর্শন হয় না, শ্রীকৃষ্ণ থেকে জন লিলি একই কথা বলে গেছেন।
সবাই বলত পড়াশোনায় মাথাটা আমার বেশ ভালোই! ঝিমলিও হয়তো তাই ভেবেছিল! কিন্তু বরাবরই আমার গড়পরতা কিছুই ভালোলাগে না। দাদা খুব হিসেব করে চলত। কলেজে থাকতেই ছাত্র-রাজনীতি, ভোট, মিছিল, মিটিং, সাথে রঙবেরঙের স্বপ্ন বুনে দেয়া তরুণ পলিটিসিয়ান! তারপরে আখের গুছিয়ে কাট্টুস! আমার ওসব আসে না! তাই ঝিমলিকেও বোধহয় ঠিকঠাক স্বপ্ন দেখাতে পারিনি। বেকার বাউন্ডুলে প্রেমিকের থেকে, গান্ধীর হাসি ভরা নোট গোনা অফিসার অনেক দামি। প্রেমও হরেদরে সেই ডারউইনের থিওরি, "সার্ভাইবাল অফ দ্য ফিটেস্ট "।এখন তাই ইংলিশ ফন্টে বাংলা ভালোবাসা ভরা মেসেজ গেছে কমে। হাড়হাভাতে ফোনটা তবু অপেক্ষায় থাকে। তবু আজো বুকপকেট ভরতি ঘামে ভেজা প্রাইভেট টক!
ভীষণ ঘুম পাচ্ছে! আজ ফিরেছি দেরিতে। খাবার গুছোনো ছিল টেবিলে, খেয়ে নিয়েছি। একবছর আগে পর্যন্ত মা বসে থাকত। তখনো পর্যন্ত বাড়ির কিছু নির্বিরোধ সমস্যা জানাত। হয়তো আশা ছিল কোথাও আমিও কালেকালে দাদা হয়ে উঠব। মশা ধূপ জ্বলছে, অভ্যস্ত মশা গুলো তাও বার করে নেবে জীবনের নির্যাসটা! কড়া ধোঁয়ায় দেখছি কিছু মুখ, ঝাপসা । ওরা কারা? মা বাবা দাদা ঝিমলির মতো লাগছে! দেখতে আলাদা, কিন্তু সেই চেনা গন্ধ একেক জনের! আমার হাতে অনেক গুলো মুখোশ! ছড়িয়ে পড়ে আছে মায়ের তেলচিটে আঁচলটা, বাবার পেন, দাদার গিটার , ওই তো ঝিমলির সেই বুকের কাছের লাল তিলটা! রোজ সূর্যাস্ত দেখতাম, ওটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে! সেই পুরনো মিলটা,তেলকলটা ! বিকেলে পাড়ার মোড়ের ক্যারামবোর্ড! চারিদিক নিশ্চুপ! কথাগুলো, শব্দগুলো ফুরিয়ে গেছে! মাথার করিডোর অন্ধকার, মোমবাতিগুলো মিছিলে যাচ্ছে হেঁটে! বুকের কষ্টটা নিঃশ্বাসে চেপে বসছে। উফফ! স্বপ্নটাও বলছে, সব প্রাইভেট টক শেষ, শেষ, শেষ.....!